লেখকঃ শাহী ইমাম ফাহিম
গ্রীষ্মের ছুটি! আমার ছেলে অনিক বায়না ধরেছে ঘুরতে যাবে। কিন্তু স্ত্রী শায়লা অসুস্থ, এ অবস্থায় তাকে নিয়ে যাওয়া যায় না, আবার ছেলের ইচ্ছাও অপুর্ণ রাখা যায় না। অবশেষে ছেলের বায়নার সামনে হার মেনে শায়লাকে বাসায় রেখে গাড়িতে করে ঘুরতে গেলাম রাঙ্গামাটি।
অনেকদিন সেই জায়গাটিতেই আমার যাওয়া হয় নি। এখানে জড়িয়ে আছে আমার অনেক স্মৃতি, আর কিছু...
আবহাওয়াটা একটু মেঘলা, তবুও চমৎকার ঘোরাঘুরির জন্যে। একটু হাওয়া বইছে, রাঙ্গামাটির এক পাহাড়ে গাড়ি থামালাম। ছেলে গাড়ি থেকে নেমেই ছুটোছুটি শুরু করে দিয়েছে। তাকে সামলাতে গিয়ে হঠাৎ এমন এক জায়গায় পৌঁছালাম যেখানে সবুজ ঘাসের মধ্যে কিছু অপরিচিত লাল রঙের ফুল দেখলাম, এই ফুল শুধু এক জায়গায়ই হতো...
হোটেলে খেতে যাবো, এই সময় মেরী চাচীর সাথে দেখা হলো। একসময় তিনি আমার প্রতিবেশী ছিলেন যখন আমি আব্বআ আম্মার সাথে রাঙ্গামাটি থাকতাম। আমাদের দেখে তিনি হোটেলে খেতেই দিলেন না, জোর করে উনার বাসায় নিয়ে গেলেন। দুপুরের খাবারটা সেখানেই করলাম। চাচীর বারান্দাটা খোলামেলা তাই খাওয়া শেষে সেখানে গিয়ে বসলাম। সেখানে বসে সবুজ পাহারগুলো দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। অনিক বাড়ির কুকুরটার সাথে খেলা করছে।
ঠিক পনেরো বছর আগে আমি এখানে এসেছিলাম। বাবা প্রায়ই ট্রান্সফার হতেন, ফলে নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া শিখে ফেলেছিলাম। স্কুলের প্রথম দিন সবার ভয় লাগে, কিন্তু আমার স্কুল পরিবরতন করতে করতে অভ্যাস হয়ে গেছে।
রাঙ্গামাটি আমাকে যেমন মুগ্ধ করেছিলো, তেমনি স্কুলটাকে আমার কাছে আকর্ষণীয় করেছিলো। স্কুলে সবাই আমাকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করলো। কিন্তু অদ্ভুত লাগলো একজনকে দেখে।
আমি অবাক হলাম ছেলেটি লাল কলম দিয়ে লিখছে, এছাড়াও তার অধিকাংশ জিনিসই লাল রঙের, পাশের বন্ধুর কাছে শুনলাম স্কুলের কেউ তার সাথে কথা বলে না এমনকি শিক্ষকেরা তাকে লাল রঙের কলম ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।“
“বাবা, বাবা। বাইরে চলো,” অনিকের ডাকে আমি চমকে গেলাম, তাকে নিয়ে আমি এক পুকুরের পাড়ে গেলাম। অনিকের পানি থেকে আবার ভয়, শায়লাও নিষেধ করে দিয়েছে পানির কাছে না থাকতে, আমার মন অজান্তেই তাকে এক জায়গায় নিয়ে গেলো যেখানে আমি যেতে চাচ্ছিনা। কেন যেনো মনে হচ্ছে শরীর আমার বিরুদ্ধে কাজ করছে, চোখে পড়লো সেই বাড়িটা, তবে ধ্বংসপ্রায়, বাগান মরে গেছে, বাড়ির চারিদিকেই ফাটল ধরেছে, মনে হঠাৎ এক ভয়ের অনুভূতি লাগলো কিন্তু অনিক এসব লক্ষ্য করছে না। সে আশেপাশের পরিবেশ দেখায় ব্যস্ত।
“কেউ কথা না বললেও আমি ঐ ছেলেটির বন্ধু হয়ে যাই, তার নাম অন্তনু, আমি বুঝিই না কেনো তার সাথে কেউ কথা বলতো না। দিনের বেশিরভাগ সময়ই আমরা একসাথে থাকতাম। তবে লক্ষ্য করলাম তার সম্বন্ধে কিছু জানতে চাইলেই সে অগ্রাহ্য করতো। আমার বাড়িতে তার আসা হলেও সে কখনোই আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যায়নি। তবে বাইরে থেকে বুঝতে পারতাম সে একাই থাকে, আর বাড়ির সব পর্দা লাল!”
হঠাৎ বৃষ্টি নেমে পরলো, কোনো উপায় না দেখে আমাদের সেই বাড়িতেই অবস্থান নিতে হলো। আমার মন না না করছে, শরীর যেনো শিথিল হয়ে আসছে।
বর্ষার সময়, পড়ে ফেরার পথে এসে, ফিরতে গিয়ে দেখি সন্ধ্যা হয়ে গেছে, এ সময় নামলো প্রবল বৃষ্টি, আর দুর্ভাগ্য যে আমি অন্তনুর বাড়ির সামনে আটকে গেছি। যে বৃষ্টি আমার তার বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় ছিলো না। বৃষ্টির ফোঁটা আমাকে প্রায় ভিজিয়েই দিয়েছে, আমি বাড়িতে ঢোকার পথ খুঁজছি। কিন্তু কোনো দরজা বা জানালায়ই খোলা নেই। তখন চোখে পরলো দোতালায়ই একটা জানালা খোলা আছে আর তার সাথে আছে গাছের একটি বড় ডাল। আমি গাছ বেয়ে সেই বাড়িতে প্রবেশ করলাম।
একটু ভয় করছে। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লক্ষ্য করলাম লাল পর্দা আর কালো ফার্নিচার এক ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরি করেছে। একটা অন্ধকার দরজা দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। তবু আমার কৌতূহলী মন অজান্তেই সেখানে ঢুকে পরলো, উফফ। খুব অন্ধকার, টর্চ জ্বালিয়ে সামনে কিছু “লাল ফুল” দেখলাম, সুন্দর গন্ধ আসছে তবে সামনে যেতেই গন্ধটা দুর্গন্ধে পরিণত হলো। দেয়ালে টর্চ পড়তেই দেখলাম এক সুন্দর ছেলের ছবি দেয়াল জুড়ে আঁকা। আর ঠিক নিচেই এক টেবিলে ওই ছেলেটির আধাপচা মাথা। আমি চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেলাম।
“অনিক চলো এইখান থেকে”
“তাহলে তো ভিজে যাবো তো বাবা”
“কিছু হবে না চলো”
দৌড়িয়ে এক চায়ের দোকানে আশ্রয় নিলাম। আমি কিছু ভাবতে চাইনা। না, কিছু না। দোকানের এক চেয়ারে ঘুমিয়ে পরলাম।
“আমার যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আমি লাল বড় এক খাটে শুয়ে আছি। পাশে অন্তনু, প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখ, প্রথমে কথা বলার সাহস পাচ্ছিলাম না, পড়ে তাকে এসবের জানতে চাইলাম। সে চুপ ছিলো। “বলো অন্তনু, বলো।”
সে কাঁদতে শুরু করলো। ার বলতে আরম্ভ করলো।
“আমার এক মামাতো ভাই ছিলো, তার সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। সবসময় একসাথেই থাকতাম। আমার জন্মদিনের দিন সে হঠাৎ আমাকে এক নির্মাণরত বাড়িতে নিয়ে যায়। রাত ছিলো আর চারিদিকে অন্ধকার ছিলো। আর চারিদিকে যন্ত্রপাতি ছড়ানো। হঠাৎ সে উধাও হয়ে গেলো। আমার তো স্ট্রোক করার মতো অবস্থা। একা একা হাঁটতে হাঁটতে তাকে ডাকছি। কোনো সাড়া শব্দ নেই। তখন আমি বাড়ির চারতলায়। হঠাৎ পিছন থেকে পায়ের শব্দ ভেসে আসে। আমি ভয় পেয়ে না দেখেই পিছনে এসেই আমার মামাতো ভাইকে ধাক্কা দেই। হে ঈশ্বর! মামাতো ভাই নিচে পড়ে গেছে। বড় কাঁটার কারণে তার গলা কেটে ছিন্ন হয়ে গেছে। আমার পাগল হয়ে যাবার অবস্থা, কিন্তু মনে শক্তি আনলাম। এই ভুল সমাজে কেউ মেনে নেবে না, আমি তখন লক্ষ্য করলাম আমার পাশে র্যাপিং করা একটা বক্স।
খুলে দেখলাম একটা লাল রঙের শার্ট। সাথে একটি চিরকুট “লাভ ইউ ভাইয়া” আমি আর নিজেকে ঠেকাতে পারলাম না। কেন জানি তার ছিন্ন মাথা হাতে নিয়ে পালিয়ে গেলাম অনেক দূরে। আমার নামে মোটা টাকার দলিল ছিলো তাই কোনো সমস্যা হয় নি। শুনেছিলাম সেই ঘটনার পর আম্মু পাগল হয়ে গিয়েছিলো। আব্বুও আমাকে আর খুঁজতে আসেনি।
তরুণ, আমার ভাইয়ের লাল রঙ খুব পছন্দ ছিলো। তাই আমিও সবকিছুতে লাল রঙ করি, এতে মনে হতো তরুণ আমার সাথেই রয়েছে, আমার পাশেই আছে।
কথা শুনে আমি তখনি সেখান থেকে চলে আসলাম। লালবাড়ি থেকে অনেক জোরে কান্নার শব্দ হচ্চে। বাবার সেসময় ট্রান্সফার হলো ঢাকায়। তার মধ্যে অন্তনুকে আর স্কুলে দেখিনি, কথাও হয়নি আমাদের মধ্যে।
“বাবা, ওঠো। দেখো কি সুন্দর রোদ উঠেছে,” আমি খুশি মনে বললাম চলো আরেকটু ঘুরি। এদিকে শায়লার ফোন এসেছে, তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে বলেছে, আমরা ঘুরাঘুরি করে আবার সেই পাহাড়ের সামনে আসলাম। শুনেছিলাম অন্তনু পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলো, আর এই পাহাড়েই তার কবর দেওয়া হয়। তবে কি ফুলগুলো?!
না আমি আর এসব নিয়ে ভাবতে চাইনা। ছেলেকে একটা চকলেট কিনে দিয়ে ঢাকার পথে রওনা হলাম।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন