লেখকঃ মাহমুদুল হাসান সাগর
২০০৬ সাল তখন, ক্লাস থ্রি কি ফোরে পড়ি।
দেখতে শুনতে নাদুস-নুদুস বলতো সবাই, তাই পছন্দও করতো সবাই। এমন বয়সে যেমনটা হয় সবার, শিশুদেরকে অতি সোহাগে ভালবাসায় রাখা হয়। বেশি খেলা যাবে না ব্যাথা পাবে, বেশি বৃষ্টিতে ভিজা যাবে না ঠান্ডা লাগবে, রোদে থাকা যাবে না কালো হয়ে যাবে, মানে একেবারে দুধে আলতার মত অবস্থা কিন্তু তারাই যে পরে এই দুধে আলতা ভাবটা পাঠ্য বইয়ের চাপে আর কোচিং প্রেমের অজুহাতে কৃষ্ণ কলিতে পরিনত করে তার খবর নাই। তবে যাই হোক কৃষ্ণ কলি রংটা ও খারাপ না বেশ ভালই। আর এই রঙ আসার সাথে সাথেই শৈশবের স্মৃতি গুলো গাঢ় হয়।
শৈশবে বাবা মার এমন ভালোবাসা আর্দ্র এখন খুব ভাল লাগলেও তখন কিন্তু লাগত না, এসব তখন বিরক্ত করত , ভাবতাম আমি এত বড় হ্য়েছি তাও এমন করে ক্যান। তাই চে্স্টা করতাম নিজে কে ঘর থেকে বা বাবা মা থেকে যতটা দূরে রাখতে পারি। যেমন খেলতে গেলে দেরি করে বাড়ি ফিরতাম, অজুহাত বানিয়ে মামা বা ফুপুর বাসায় চলে যেতাম, স্কুলে নানার অজুহাতে সময় দিতাম। এভাবেই সেই ছোট থেকে আমি স্কুলে পরিচিত হতে লাগলাম। এর পিছনেও একটা কারন আছে সেটা হল সেই ১০ বছর বয়সে যখন অনেকেই গুছিয়ে কথা বলতে পারত না আমি খুব পারতাম। ,মানে কথা আমি কমই বলতাম তবে যেটুকু বলতে পারতাম উচ্চারন ঠিক ঠাকই হত যেটাকে খাটি বাংলায় বলে সুস্পষ্টভাষী।
যার ফলে আমি আমাদের স্কুলের এ্যাসিসটেন্ট প্রিনসিপালের ও খুব প্রিয় ছিলাম। তার পুরো নাম মনে নেই, তবে তাকে কৃষ্ণা ম্যাম বলতাম তা মনে আছে। এর সাথে হয়ত আরও কারন ছিল যেমন আমি তাকে খুব পছন্দ করতাম, তার চেহারা আমার বড় ফুপুর মত মনে হত, আর তখন ভাবতাম ফুপুই আদ্র করে সবচাইতে বেশি। আর দুধে আলতা ভাবটাকেও এখনে ফেলে দেওয়া যায় না।
২০০৬ সালের দিকে ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস স্যার শান্তিতে নোবেল পান, আর ওই বছরই ফিফা ওয়াল্ড কাপে ইতালি জয় লাভ করে। তখন দেখে এই দুই জন ব্যক্তি প্রতি খবরের পাতায় প্রধান শিরোনাম। এক জন মুহাম্মদ ইউনুস স্যার আর ইতালির দলের প্রধান বা দলপতি জিনেদিন জিদান, যে তখন বিপক্ষ দলের খেলোয়ারকে নিজ বেলু মাথা দিয়ে সজোরে গুতা দেওয়ার ফেলে ফাইনাল ম্যাচ থেকে রেড কার্ড প্রাপ্ত। তারা ঢাকায় আসছেন। তাদের সংবরধনা দেওয়ার জন্য স্কুল থেকে আমাকে বাছাই করা হল। আমিও বাড়ি থেকে দুরে থাকতে পারব বলে গেলাম। তাদের আমন্ত্রন জানাতে গ্রামীন ব্যাংকের সামনে দাড়িয়ে গাইলাম “এই পদ্মা এই মেঘনা এই যমুনা সুরমা নদী তটে” গান টি। গান শেষে ম্যাম নিয়ে প্রধান ফটকে দাড় করিয়ে দিলেন রজনীগন্ধা হাতে, কারন মিডিয়া কাভারেজের জন্য কিছু ফুট ফুটে বাচ্চা লাগবে। যাই হোক আমি গিয়ে দাড়ালাম, হুটকরে দেখি মুল ফটক থেকে বের হয়ে এলেন দুই জন লোক, এক জনের পরণে পাঞ্জবি পায়জামা, এই ইনিই নাকি ক্লাসে সাধারন জ্ঞানে পড়া বাংলাদেশের এক মাত্র নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুস। আর অপর জন বেলু, যিনি নাকি ফ্রান্স ফ্রান্স ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন।তাদের দেখা মাত্র সবাই যারা ফুল হাতে দাঁড়িয়ে ছিল তারা ফুল ফেলে দিয়ে সাক্ষর নিতে হাত আগিয়ে দিচ্ছিল। আমি অন্যদের মত করলাম না, হয় তো ম্যাডামের দেয়া দায়িত্বের কারনেই। কিন্তু দেখলাম জিনেদিন জিদান আমরা হাত থেকে রজনীগন্ধা নিয়ে নিজে আমার হাতে এক্ টি সাক্ষর করে দিল। অথচ আমার পাশে থাকা একটি সুন্দরি মেয়েকে দিল না, পরে সে চলে গেল।
আমি কিছুক্ষন তাদের যাবার পথে চেয়ে রইলাম, তার পরে মেয়েটির দিকে চাইলাম, পরে নিচে ফেলে দেওয়া অন্যদের ফুল গুলোর দিকে ও চাইলাম। পরে তাকালাম আমি আমার হাতে করা ফ্রান্স দলপতির সাক্ষর দেখলাম তারপর বল্লাম “ছি, লোকটা এত বড় হয়েও লিখতে পারে না, কি বাজে হাতের লিখা” এই বলে আমি মুছে ফেললাম সেটি আমার প্যান্টে। পরে নিচে পরে থাকা ফুল তুলতে শুরু করে দিলাম।।
বুদ্ধি হবার পর, আজও শুধুই বলি আর ভাবি , হ্যায় তখন যদি হাতটা কেটে রাখতে পারতাম। তখন বাড়ি ফিরে শুনেছিলাম আমাকে নাকি এটিএন চ্যানেলে দেখিয়েছে, আমি অনেক খুজেছি সেই প্রতিবেদনটি কিন্তু পাই নি। তবে যত দিন বেচে আছি এই স্বাক্ষর স্মৃতিটি আমি ভুলছি না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন