লেখকঃ সিফাত সাদিকীন
ফ্যানটা ঘুরছে, প্রতিদিনের মতই। কিছু বিষয় আছে যেগুলো আমাদের চোখের সামনে থাকে,কিন্তু আমরা গুরুত্ব দিই না। ঠিক ফ্যানটার মতো। সে ঘুরছে, আমাদের প্রয়োজন মেটাতেই। কিন্তু আমরা তাকে প্রথম দিনের পরের দিনই ভুলে গেছি। ফ্যান যদি প্রাণী হত, আর সে যদি বুঝতে পারত তাকে আর কেউ গুরুত্ব দেয় না, তাহলে সে কি করত? উত্তর জানা আছে? । তবে সাজু জানে তাকে কি করতে হবে। কারো কাছে তার গুরুত্ব নেই। একটি রেজাল্ট তাকে গুরুত্বহীন করে তুলবে সবার কাছে? মানুষ হিসেবে তার কি কোনো গুরুত্ব নেই? নিজেকে হঠাৎ করেই খুবই অপরাধী মনে হয় তার।
সবার চোখে সে ভালবাসা খুঁজেছে, স্বান্তনা খুঁজেছে । কিন্তু সেখানে সে বিরক্তি ছাড়া কিছুই দেখতে পায় নি। একটা উটকো ঝামেলা যেন সে। তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না। কেন বাঁচিয়ে রাখবে নিজেকে সে? প্রতিবেলা খাবার দেয়া ছাড়া নিজের মা তার মুখও দেখছে না। বাইরের ঘরে সবাই আনন্দ করছে,অবশ্য তাকে একবার ডাকার প্রয়োজনবোধ করল না কেউ! সে কি আনন্দে ভাগ বসানোর অধিকারটাও হারিয়েছে। ছোট বোনটাকেও এ ঘরে আসতে দিচ্ছে না। যদি ছোট মেয়েটাও বখে যায়। রেজাল্ট খারাপ করে। আর বাবা তো বলেই গেছে,এ বাড়িতে যেন তার মুখ আর যেন না দেখে। এ কি শুধুই কথার কথা? না তাকে ঝামেলা প্রমাণ করা? নিজের ফ্রেন্ডস? তারাও তো আর পাত্তা দিচ্ছে না তাকে।
সবাই ব্যস্ত এডমিশন নিয়ে । তাকে একটু স্বান্তনা, একটু ভরসার বাণী শোনাবে কে? বেস্টফ্রেন্ড? সেও কেমন জানি এড়িয়ে চলছে। ভাল চাকরি পাবে না, কম মাইনে পাবে এজন্যই কি তাকে আর ভাল লাগছে না? সাজু কিছু বুঝে উঠতে পারে না। তবে সে বুঝে গেছে,এ পৃথিবীতে সে এখন মূল্যহীন জড় বস্তু। এখানে বাঁচার অধিকার নেই তার।
পরদিন সকাল। ফ্যানটা আর ঘুরছে না। তাতে ঝুলে আছে ১৯ বছরের এক কিশোরের লাশ,নাম সাজু! সেই সাজু। । নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন আরমান সাহেব। নিজের ছেলে, এতটা একা করে দেয়া উচিত হয় নি ছেলেটাকে। এই ছেলের হাতে ধরেই একসময় মেলায় যেতেন তিনি। ছেলের কি সেই আনন্দ। এটা কিনে দাও, ওটা কিনে দাও, কত বায়না! ছেলে আজ বড় হয়ে গেছে। ভালবাসা কমে গিয়েছিল তাই বলে। স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন তিনি। চোখ থেকে অঝোর ধারায় জল ঝড়ছে। এদিকে মিসেস আরমান কয়েকবার অজ্ঞান হয়ে গেছেন। খিচুনি শুরু হয়েছে তার। ছোট বোনটার চোখে জল নেই। নিশ্চুপ,নির্বাক বসে আছে। যেন জড় বস্তু। ভাইয়ের সাথে খুনসুটি গুলো আজ যন্ত্রণা হয়ে ঘুরছে দেয়ালে দেয়ালে। বাড়ির যেদিকে তাকায় সেদিকেই তাদের খুনসুটির চিহ্ন। এইতো গত বছর, বাবা বাড়িতে নেই, ঝড় চলছে বাইরে। এরই মধ্যে কোথা থেকে ডাক্তার নিয়ে হাজির হল ভাই। বোনের যে অনেক জ্বর। এত ভালবাসা আজ যন্ত্রণা। হ্যা,যন্ত্রণা। কিছু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোরী, চোখে জল। সাজুর খুব কাছের কেউ ছিল একদিন। এখন সব অতীত। কলেজ বাদ দিয়ে পার্কে পার্কে ঘুরতে যাওয়ার দিনগুলো আজ তীব্র ব্যাথা হয়ে আঘাত করছে। প্রিয় মানুষটি আর নেই যে। । তার একমাস পরের কথা। আরমান সাহেব আর সেই বাড়িতে থাকতে রাজি হয়নি। চারদিকে ছেলের স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, অপরাধবোধ কাজ করে। তাই নতুন বাসায় চলে গেছে তারা। সেই ফ্যানটাও বেচে দেয়া হয়েছে। আর ধীরে ধীরে সবটা ভুলতে লাগল তারা। বাবা ব্যস্ত হয়ে পড়ল অফিসের কাজে। মা সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বোনটার পড়ালেখার চাপ বেড়েছে। বই খাতা নিয়ে সারাদিন বাইরেই থাকতে হয়।
সবাই সুখী । সাজুকে ভুলে গেছে সবাই। যাদের জন্য সে মারা গিয়েছিল তারা তো সুখী এখনো, তাহলে? সাজুর মৃত্যুর ফলাফল কি শুধু সাময়িক একটু কান্না? একটু অপরাধবোধ? তাকে ভুলে গিয়েছে দেখে সাজুর প্রেতাত্মার কি আবারো অভিমান হবে? আবারো সে সুইসাইড করবে? সব তো ঠিকই আছে, শুধু সে নেই।
সেই বিক্রি করে দেয়া ফ্যানটা আজও রয়ে গিয়েছে কোথাও। সেটাও দিব্যি ভাল আছে। প্রতিদিনের ঘটনার আজো - ফ্যানটা ঘুরছে।
আত্মহত্যা কখনই কোনোকিছুর সমাধান নয়। জীবনে দুরদর্শী হতে পারলেই সফলতা আসবে, আত্মহত্যা বলে জীবনকে বাই বাই বলে চলে গেলে কেউ সত্যই মনে রাখবে না মানুষ তাকে। অভিমানটাকে শক্তি বানিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে সবাইকে। তাই জীবনে প্রতিটি মোড়ে ঘুরে দাঁড়াতে শিখতে হবে আমাদের। অনেক মানুষ, অনেক ব্যাক্তিত্ব আছেন, যারা আত্মহত্যার মুখ থেকে আবার ফিরে এসে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন পুরো বিশ্বকে, যার মধ্যে তোমার প্রিয় হ্যারি পটারের স্রষ্টা জোয়ান ক্যাথেলিন রাওলিং একজন। কোনো কিছুই স্থায়ী নয়, তেমনি তোমার ব্যার্থতাও স্থায়ী নয়। কাজেই ঘুরে দাড়াও, হতাশ হবে না কখনই।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন